প্রবাসীর ঘামে বদলাচ্ছে পরিবার,দূরত্বের আগুনে পুড়ছে পারিবারিক সম্পর্ক!
প্রবাসীর পাঠানো অর্থে চলে সংসার, কিন্তু দূরত্বে বদলে যাচ্ছে পারিবারিক সম্পর্ক

একদিকে বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম, অন্যদিকে দেশে স্বজনদের অপেক্ষা। মাস শেষে ব্যাংক কিংবা মোবাইলের মাধ্যমে দেশে আসে উপার্জনের টাকা। সেই টাকায় চলে সংসার, সন্তানের পড়াশোনা, বাবা-মায়ের চিকিৎসা, তৈরি হয় বাড়ি কিংবা কেনা হয় জমি। অর্থনৈতিকভাবে বদলে যায় একটি পরিবার।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রবাসীর পাঠানো অর্থে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়লেও সেই পরিবারের আবেগ, সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধন কতটা অটুট থাকছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান এখন আর শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের লাখো পরিবারের জীবনযাত্রা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসেছে প্রায় ৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।
এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে রয়েছে পরিবারের ভেতরের এক ভিন্ন বাস্তবতা।
অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বনাম পারিবারিক দূরত্ব
একজন মানুষ যখন পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বিদেশে যান, তখন মূলত নিজের বর্তমানকে বিসর্জন দিয়ে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পরিবারের বাইরে থাকার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তৈরি হতে পারে মানসিক দূরত্ব। যোগাযোগের ঘাটতি, সন্দেহ, পারস্পরিক অবিশ্বাস কিংবা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ অনেক সময় দাম্পত্য সম্পর্কে চাপ তৈরি করে।
দেশে থাকা স্ত্রী কিংবা স্বামীকে একাই সামলাতে হয় সংসার, সন্তানদের দেখাশোনা, সামাজিক দায়িত্ব এবং পারিবারিক নানা সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে বিদেশে থাকা মানুষটির ওপর থাকে কাজের চাপ, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের মানসিক চাপ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানো আর পরিবারের সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত থাকা এক বিষয় নয়। নিয়মিত অর্থ পাঠালেই সম্পর্কের সব দায়িত্ব পূরণ হয় না। প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, আস্থা, সময় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একে অপরকে যুক্ত রাখা।
সন্তানদের বেড়ে ওঠায় প্রবাসী বাবা-মায়ের অনুপস্থিতি
প্রবাসী পরিবারের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা হচ্ছে সন্তানদের শৈশব ও কৈশোর। অনেক শিশু বাবাকে বড় পর্দার ভিডিও কলে দেখে, মায়ের সঙ্গে কথা বলে ফোনে। জন্মদিন, স্কুলের অনুষ্ঠান, অসুস্থতা কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাবা-মায়ের একজন বা দুজনই অনুপস্থিত থাকেন।
২০২৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে একটি গুণগত গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি অনেক কিশোরের মধ্যে একাকিত্ব, বঞ্চনাবোধ ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তবে প্রবাস থেকে পাঠানো অর্থ পরিবারের আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য বাড়িয়ে সেই কষ্টের কিছুটা প্রশমনও করে। গবেষণাটিতে বাবার দিকনির্দেশনা ও মানসিক উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।
অর্থাৎ সন্তানের জন্য শুধু ভালো স্কুল, দামি পোশাক কিংবা উন্নত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। তার মানসিক বিকাশে বাবা-মায়ের সময়, স্নেহ, শাসন ও সরাসরি অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব কার?
প্রবাসী পরিবারের আরেকটি বড় বাস্তবতা হচ্ছে দেশে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মা। সন্তান বিদেশে থাকায় অনেক সময় তাঁদের দৈনন্দিন দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে অন্য সন্তান, পুত্রবধূ, মেয়েজামাই কিংবা আত্মীয়স্বজনের ওপর।
প্রবাসী সন্তান অর্থ পাঠিয়ে চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার খরচ মেটালেও অসুস্থতার সময় পাশে থাকতে না পারার কষ্ট থেকে যায়। হাসপাতালে নেওয়া, নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো, মানসিক সঙ্গ দেওয়া কিংবা জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শারীরিক উপস্থিতির বিকল্প সব সময় অর্থ হতে পারে না।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের অভিবাসনের সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ফলে দেশে থেকে যাওয়া নারী ও বয়স্ক পরিবারের সদস্যদের ওপর পরিচর্যার অতিরিক্ত দায়িত্ব তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ প্রবাসের সুফল যেমন পরিবারের কাছে পৌঁছায়, তেমনি এর কিছু সামাজিক ব্যয়ও বহন করতে হয় দেশে থাকা সদস্যদের।
রেমিট্যান্স কি পরিবারের স্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করছে?
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করছে। কিন্তু সব পরিবার সেই অর্থকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপান্তর করতে পারছে না।
অনেক ক্ষেত্রে পুরো অর্থ ব্যয় হচ্ছে ভোগ ও দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে। আবার কোথাও জমি-সম্পত্তি কেনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ কিংবা অর্থের ব্যবহার নিয়ে পারিবারিক বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
এখানে প্রয়োজন আর্থিক পরিকল্পনা, সঞ্চয়, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে স্বচ্ছতা। কারণ একজন প্রবাসী বছরের পর বছর পরিশ্রম করে যে অর্থ পাঠাচ্ছেন, তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে দেশে ফেরার পর তাঁর আর্থিক নিরাপত্তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
প্রবাসী আয় বাড়ছে, কিন্তু প্রবাসীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ছে। তবে এই আয়ের পেছনে রয়েছে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের শারীরিক পরিশ্রম, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ।
বিদেশে যাওয়ার জন্য ঋণ করা, দালালের প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পাওয়া, বেতন আটকে রাখা কিংবা আইনি জটিলতায় পড়ার মতো সমস্যাও অনেক শ্রমিকের জীবনে প্রভাব ফেলে।
তাই শুধু কত ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, সেই হিসাব করলেই প্রবাসীদের সামগ্রিক অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কতজন নিরাপদ কর্মসংস্থান পেয়েছেন, কতজন ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন, কতজন ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারছেন এবং দেশে ফিরে কতজন সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসিত হচ্ছেন—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্র ও পরিবারের করণীয় কী?
বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকে প্রাধান্য দিলে চলবে না। প্রবাসীদের পরিবারকেও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
এ জন্য প্রয়োজন—
প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করা।
বিদেশে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।
প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সঞ্চয় বিষয়ে সচেতন করা।
দেশে থাকা শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করা।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও পরিচর্যায় সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানো।
দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।
প্রবাসীদের সঙ্গে পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগ ও পারস্পরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে হয়তো একটি পরিবারের অর্থনৈতিক চাকা সচল থাকে, কিন্তু সেই অর্থের পেছনে থাকা মানুষটির অনুভূতি, ত্যাগ ও একাকিত্ব অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
একজন প্রবাসী শুধু পরিবারের জন্য টাকা উপার্জন করেন না; তিনি নিজের সন্তানদের শৈশব, বাবা-মায়ের শেষ বয়সের সঙ্গ এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর অনেক মূল্যবান সময়ও বিসর্জন দেন।
তাই প্রবাসীদের অবদান মূল্যায়ন করতে হলে শুধু রেমিট্যান্সের অঙ্ক দিয়ে তাঁদের বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে তাঁদের পরিবার কতটা ভালো আছে, সন্তানরা কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে, বৃদ্ধ বাবা-মা কতটা যত্ন পাচ্ছেন এবং প্রবাসী নিজে কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাচ্ছেন।
কারণ, একটি দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি পরিবারগুলোও শক্তিশালী হওয়া জরুরি। প্রবাসীর পাঠানো অর্থে সংসার চলতে পারে, কিন্তু একটি পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও মানসিক উপস্থিতি।



